Monday, November 21, 2016

(অন্যরকম ভালবাসা) অনুতপ্ত--,

Edit Posted by with No comments
মোবাইলটা বেজেই চলেছে । একবার দুইবার
তিনবার… । অপরিচিত কোন নম্বর থেকে ফোন
এলে নিশীতা ধরেনা । বছর তিনেক
হলো অপরিচিত নম্বরের কল রিসিভ করা বন্ধ
করে দিয়েছে । হাতেগোনা গুটিকয়েক
জানাশুনা মানুষের
সঙ্গে দরকারি কথা ছাড়া অন্যকোন লোকের
সাথে ফোনে কথা বলতে চায়না নিশীতা ।
যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে । স্বপ্নে বিভোর সেই
এলোমেলো দিনগুলো এখন আর নেই নিশীতার ।
সেসব তিন বছর আগের কথা । অতীত ।

নিশীতা এখন অনেক কিছুই বোঝে । অনেক
শিখেছে । অনেক কিছুই দেখেছে । সমাজ-
সংসার, আবেগ, প্রেম-ভালোবাসা,পুরুষ মানুষ
সবকিছুই । এখন আর কাউকেই বিশ্বাস
করতে পারেনা । এমন কি মাঝে মধ্যে নিজেকেও
না ! এজন্য নিজেকে সবসময় বড্ড
বেশী সাবধানে রাখতে চায় । নতুন কোন ভুলের
দরজায় আর পা দিতে চায় না সে ।

ফোনটা এখনও বাজছে । আননোন নম্বর । এভাবেই
একদিন পরিচয় হয়েছিলো রাজিবের সঙ্গে ।
কোটিপতি বাবার পুত্র ! তারপরের একবছর স্বপ্নের
মতো কেটেছে নিশীতার । বান্ধবীরা ওকে খুব
হিংসা করতো । রাজিব প্রায় প্রতিদিনই
প্রাইভেটকার নিয়ে নিশীতার হলের
সামনে আসতো । নিশীতা যখন নামী-
দামী ড্রেস ও কসমেটিকস পরে বান্ধবীদের
সামনে দিয়ে বাজিবের হাত ধরে প্রাইভেট
কারে চড়তো, তখন বান্ধবীদের
আঁড়চোখে তাকিয়ে থাকা দেখে নিজেকে রাজপরিবারের
একজন বলে ভাবতো । পাড়াশুনা চরমভাবে ব্যহত
হচ্ছিল নিশীতার । দুটি সেমিস্টারের গ্রেড
পয়েন্টও ফল্ট করলো । ফারুক
মাঝে মধ্যে নিশীতাকে বোঝানোর
চেষ্টা করতো । ফারুক ছিলো নিশীতার দূর-
সম্পর্কের চাচাতো ভাই । ছোটবেলা থেকেই
নিশীতাকে চেনে । রাজিবের সাথে নিশীতার
সম্পর্কের ব্যাপারটা ফারুক না জানলেও
সেমিস্টারের গ্রেড পয়েন্ট ফল্ট করার খবর
শুনে বুঝতে পেরেছিলো ভেতরে ভতরে কিছু
একটা হচ্ছে । আরো নিশ্চিত হলো, যখন
নিশীতার খারাপ রেজাল্টের
ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে তাকে চরম
ভাবে অপমানিত হতে হলো ।

অল্প সময়ের মধ্যে রাজিব ও নিশীতা খুব দ্রুত
প্রিয়জন থেকে আপনজন হতে থাকলো । আজ
চায়নিজ রেস্টূরেন্ট তো কাল নন্দন পার্ক, আবার
পরশু হয়ত বোটানিক্যাল ! শারীরিক ম্পর্শের
আনন্দগুলো ওদের কাছে একেবারে সাধারণ ব্যপার
হয়ে যেতে থাললো । এসব
ক্ষেত্রে নিশীতা কিছুই বলতোনা ।
হয়তো প্রাচুর্যের হাতছানির কারনে "না"
বলতে পারতোনা । বরং তার নিজেরও শরীরের এই
অচেনা অনুভুতিগুলোকে উপভোগ
করতে ভালো লাগতো । এভাবে যৌবনের
চাহিদাগুলো ইলাস্টিকের
মতো বাড়তে বাড়তে একদিন যখন রাজিব
একেবারে পাগলা ঘোড়ার মতো আচরন শুরু করলো,
নিশীতা সেদিন
নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি । এরপর
নিশীতা যখন বিয়ের কথা ভাবার জন্য
রাজিবকে বললো, রাজিব
বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নিয়ে বললো,
‘বিয়ে নিয়ে টেনশন করার দরকার নেই । আব্বা-
আম্মাকে সব বলেছি । এক বছরের মধ্যেই
আমরা বিয়ে করবো ।’

তারপর ! না, তারপরের ঘটনাগুলো নিশীতা আর
মনে করতে চায়না । ভুলে যেতে চায় । কিন্তু
মানুষ চাইলেই কি সবকিছু ভুলে যেতে পারে ?
নিশীতাও কি ভুলে যেতে পারবে,
কিভাবে ফারুক ভাই সেদিন তাকে অন্ধকার মৃত্যুর
দরজা থেকে আবার আলোতে এনে দাঁড়
করিয়ে দিয়েছিলো ! ফারুক ভাইয়ের
কথা মনে হতেই শ্রদ্ধায় মাথাটা নুয়ে আসতে চায়
নিশীতার । সব সময়ই অবহেলা করেছে তাকে,
অপমানও করেছে । অথচ জীবনের সংকটময়
মুহূর্তে একমাত্র সেই এগিয়ে এসেছিলো । কোন
কৈফিয়াত চায়নি ।

নিশীতা যখন স্বপ্নের
জগতে উড়ে বেড়াচ্ছিলো তখনই হটাৎ একদিন
বুঝতে পারলো তার শরীরের অভ্যন্তরে নতুন
একটা অস্তিত্বের জন্ম হয়ে গেছে ।
দিশেহারা হয়ে পড়লো নিশীতা ।

ইতিমধ্যে খবরটা সমস্ত ভার্সিটিতেও
ছড়িয়ে পড়লো । বান্ধবীরাও তাকে প্রচন্ড
ঘৃনা করতে শুরু করলো । কেউ তার
পাশে দাঁড়ালোনা । বরং সবাই
তাকে কুৎসিতভাবে ইংগিত করতে থাকলো ।
রাজিবকে তার প্রেগনেন্সির
কথা জানিয়ে নিশীতা যখন দ্রুত বিয়ের
ব্যবস্থা করতে বললো, রাজিব কোন উত্তর
না দিয়ে শুধু বললো, ‘ভেবে দেখি কি করা যায় ।’

এরপর থেকেই রাজিব সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ
করে দিল । নিশীতা রাজিবের বাসায় খোঁজ
নিয়ে জানতে পারলো, ফ্যামিলি থেকে অনেক
আগেই তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে । মানুষের
সামনে মুখ দেখানোর মতো সব পথ বন্ধ হয়ে গেল
নিশীতার । সে তখন আত্নহত্যার
কথা চিন্তা করতে লাগলো ।
ফারুকের কানে যখন ঘটনাটা পৌচ্ছালো তখন এক
মুহূর্ত দেরি না করে সে নিশীতার
পাশে এসে দাঁড়াল ।
নিশীতা বলতে সংকোচবোধ করলেও ফারুক
জোরপূর্বক বিস্তারিত সব ঘটনা শুনলো । দ্রুত ওর
অ্যাবরশনের ব্যবস্থা করলো এবং পরবর্তী এক মাস
ছায়ার মতো সর্বক্ষণ ওর সঙ্গে থাকলো ।

হাজারটা কথা বলে বুঝিয়ে বিভিন্ন প্রকার
সাহায্য করে ওকে আবার স্বাভাবিক
জীবনে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করলো । এক সময়
নিশীতা যখন অনেকটা স্বাভাবিক হলো, ফারুক
ধীরে ধীরে আবার নিশীতার কাছ
থেকে আড়ালে চলে গেল । তারপর থেকে, একবার
অন্তত ক্ষমা চাওয়ার
জন্যে নিশীতা ফারুককে আনেক খুঁজেছে, কিন্তু
পায়নি ।

( অন্যরকম ভালবাসা )স্বপ্ন, ঘুড়ি--,

Edit Posted by with No comments
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি । চোখ দুইটা বড্ড
জ্বালা করছে। একটাও খালি রিকশা নাই।
মনে মনে কল্পনা করি ঠাডা পড়ছে রিকশার উপর।

হেসে ফেলি। এই রে পাশে কখন
অধরা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। এই
মেয়ের সমস্যা কি? একটু আগে খোঁজ নিয়ে গেছে,
এখন আবার ! দুষ্টু বুদ্ধি মাথার ভিতর
তিড়িং বিড়িং লাফ দিতে থাকে! পাশ
থেকে অধরার কাচ ভাঙ্গা হাসির শব্দ
শুনতে পাই। মেয়েটা আবার শুরু করেছে। এবার আর
থামানো যাবে না, হাসতেই থাকবে।

উল্টো ঘুরে দৌড় দেয়ার চিন্তা অনেক কষ্টে দমন
করলাম। কিন্তু অধরার পরের কথা শুনে ঢোঁক
গিলেই ঝেঁড়ে দৌড় দিলাম উল্টা দিকে। কিন্তু
হায়, এখানেও কবি উলঙ্গ!
জামা ধরে ফেলেছে অধরা! আর জামার বোতাম
টান দিলেই খুঁলে যায়। পট পট করে সব বোতাম
খুলে গেছে। হায় খোদা! ধরণী এখনও
দ্বিধা হচ্ছে না কেন বুঝলাম না। আমেরিকায়
গিয়া উঠতাম, বহুত শখ আমেরিকায় যাওয়ার।
খুলনায় এত গুলা ম্যানহোল কিন্তু
আশে পাশে তাকিয়ে একটাও দেখতে পেলাম না।
হায়, ঈশ্বার নীরব, কবি উলঙ্গ! কি করব
ভাবতে ভাবতেই আবার অধরার কাঁচ
ভাঙ্গা হাসির শব্দ। নাহ,
মেয়েটাকে শায়েস্তা করা দরকার।
গম্ভীরভাবে পিছন ফিরলাম। কিন্তু এ কি!
মেয়েটার মুখে শ্রাবনের মেঘ জমে গেছে।
যে কোন সময় দখিনা জানলা খুলে ঝড় আসবে।

তাড়াতাড়ি বলা শুরু
করলাম-'শোনো আমি একটু.......'
মাঝপথে থামিয়ে দেয় অধরা। 'আজ তোমার
জন্মদিন সুমন'। চমকে উঠি আমি। মনে পড়ে যায়
সেই ছোট্ট বেলার কথা
খুব ছোট বেলায় বাবা-মা জন্মদিনে কোন উপহার
দেয়নি বলে খুব অভিমান করেছিলাম। কিন্তু
কাঁদতে কাঁদতে যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাই,
উঠে দেখি আমার রুমের টেবিলের
পুরোটা জুড়ে এক বিশাল কেক! আজ বাবা-
মা দুজনেই গ্রামে থাকেন।
বাবা ইদানিং ভালো চোখে দেখতে পাননা।
মা প্রচন্ড অসুস্থ। ছোট ভাইটার লেখা পড়ার খরচ
আমাকেই দেখতে হয়।
আবার চমকে উঠি অধরার কথায়-'শুভ জন্মদিন সুমন'
তোতলামি এসে যায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে।
অপ্সরীর মত লাগছে ওকে।
হঠাৎ ঠাস করে চড়। -'তুমি কি কিছু বোঝ না?
আমার সাথে ঠিক মতো কথা বলনা কেন?
আমি কি অন্যায় করেছি? বল সুমন?'
আমি আরো অবাক! মাঝখান
দিয়ে ব্যাগড়া বাঁধাল চোখ দুটো। এতক্ষন অনেক
কষ্টে পানি আটকে রেখেছিলাম। এবার টপ টপ
করে পড়া শুরু হল।

কিছুক্ষন পর আবিষ্কার করলাম আমি বটগাছটার
নিচে বসে আছি। ভার্সিটি লাইফে আমার
সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। মন খারাপ হলেই
এখানে চলে আসি। চুপচাপ কিছুক্ষন বসে থাকি।
ছোট্ট একটা ছেলে থাকে এখানে।
সারা গায়ে ময়লা লেগে থাকে। কিন্তু ওর পবিত্র
হাসিটা দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।
আমাকে দেখলেই দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে 'কেমন
আছো ভাইয়্যা?' পিচ্চিটার মুখে ভাইয়্যা ডাক
শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়।

-ঐ এত কি ভাবো?
*কিছু না।
-চোখে পানি কেনো?
*জানিনাহ, এমনি।
অধরা ওর ওড়না দিয়ে চোখ মুছে দেয়।
-এই দুষ্টু ছেলে, কি দেখো অমন করে?
*আ-আমি কিছু দেখিনা
-হিহিহি.....
*হাসো ক্যানো?
-অ্যাই তুমি নিজের যত্ন নাওনা কেন?
*কই?
-তোমার মুখ ব্রনে ভরে গেছে
*ও আচ্ছা
-তুমি জান তোমার চেহারা কত সুন্দর? তুমি কত
হ্যান্ডসাম?

*না জানতাম না। এখন জানলাম।
-ফাইজলামি করবা না; তোমার ব্রনের জন্যেই শুধু
খারাপ দেখায়
*হুমমম
-কি হল
*কই কিছুনা তো?
-তুমি ঠিকমতো মুখের যত্ন নেবে
*আচ্ছা
-আর বেশি বেশি পানি খাবে
*ঠিক আছে
-ফেসওয়াশ দিয়ে নিয়মিত মুখ ধুবে
*হুমম
-আর আর--
*কি?
-নাহ কিছু না। জান কত মেয়ে আমার
দিকে হিংসার চোখে তাকায়?
*নাহ জানতাম না। তবে এখন জানি।
-উফফ সব কিছুতেই তোমার ফাজলামি।
*আচ্ছা যাও, আর ফাজলামি করব না। এখন
কারণটা বল।
-কারন তুমি
*মানে কি?
-মানে তুমি অনেক হ্যান্ডসাম; আর যখন
তুমি আমার সাথে ঘোর তখন তারা হিংসায়
ছাই হয়ে যায়
*তাই নাকি?
-হ্যাঁ
*তোমার কেমন লাগে?
-কি কেমন লাগে?
*এই যে ওরা জেলাস ফিল করে?
-আমার অনেক ভাল লাগে।
*ও আচ্ছা।
-তুমি খুশি হওনি?
*না
-কেন?
*জানি না
-মানে?
*বাদ দাও
-আচ্ছা
হঠাৎ মায়ের ফোন আসে। মায়ের ফোন রিসিভ
করতেই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।
মা কান্না চেপে বলেন 'বাবা, তুই কবে আসবি?
তুই তাড়াতাড়ি আয় বাবা। তোর আব্বার
শরীরটা ভালো না।' আমি আসব বলে ফোন
রেখে দেই। বুঝতে পারি, বাবার প্রেশার এর
সমস্যা আবার বেড়েছে।
অধরার কাছ থেকে রাস্তায় নেমে যাই।
পকেটে শুধু একটা সিগারেটের বিচ্ছিন্ন অংশ
আছে। মেসে হেঁটেই যেতে হবে।
মেসে ফিরে আবিষ্কার করি বুয়া আসেনি।

রান্না ঘরে গিয়ে আরেকবার অবাক হই,
মেসে চাল আনা নেই। সকাল বেলাও
দেখেছিলাম চাল নেই। বিবর্ণ
সিগারেটটা নিয়ে ছাদে উঠে যাই।
লাইটারটা জ্বেলে সিগারেটটা জ্বালিয়ে আকাশে
ধোঁয়া ছাড়ি।
হঠাৎ আকাশে একটা প্লেন দেখতে পাই। খুব কাছ
দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ছোটবেলার
স্মৃতিগুলা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ধীরপায়ে।

ছোট বেলায় বাবার সাথে যখন প্রায়ই
ঘুড়ি উড়াতাম তখন বাবা বলতেন 'বাজান, ঐ
ঘুড়ি চালাইতে পারবা তো?' আমি বলতাম-পারমু
বাজান। যখন মাঝে মাঝে আকাশে প্লেন
দেখা যেত বাবা বলতেন 'বাজান, ঐ
ঘুড়িটা আকাশে চালাইতে পারবা?'
আমি বলতাম-হ বাজান, পারমু। বাবার চোখ
আনন্দে জ্বল জ্বল করত। আরো একটু যখন বড় হই,
বাবা আকাশে প্লেন দেখলেই বাচ্চা মানুষের মত
বলে উঠত , 'বাজান, আমার
রাইজকইন্যারে তুমি ঘুড়ি চালায়ে আনতে পারবা তো?'
আমি জবাব দিতাম 'হ বাজান, আমি পারমু।'
ভাবতে ভাবতেই চোখে পানি এসে যায়। হাতের
সিগারেটটা ফেলে উঠে দাঁড়াই।
মোবাইলটা বেজে ওঠে পকেটে। বের
করে দেখি আননোন নাম্বার। রিসিভ করলাম
কিছুটা বিরক্তভাবে। মেঘলার ফোন। অধরার
ছোট বোন। ফোন ধরেই মেয়েটা কেঁদে দিল।

'ভাইয়্যা, আপনি তাড়াতাড়ি সেন্ট্রাল
হসপিটালে আসেন। আপু খুব অসুস্থ। ভাইয়্যা,
প্লিজ আপনি তাড়াতাড়ি আসেন।'
ফোন রেখেই দৌড়ে রুম
থেকে জামাটা পড়ে ছুটলাম হাসপাতালে।
কাছেই ছিল। পৌছে গেলাম দু মিনিটেই। অধরার
ফ্যামিলির সবাইকে দেখলাম বাইরে দাঁড়িয়ে।
বুঝে গেলাম যা বোঝার।
আস্তে করে ঘরে ঢুকলাম। চোখ বুজে আছে আমার
অপ্সরী। মুখের গোলাপী আভাটাও মলীন হয়নি।
হাতদুটো জোর করে মুঠিতে চেপে ধরলাম।

আস্তে করে চোখ মেলে তাকাল অধরা।
মুখে একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো। একবার চোখ বন্ধ
করে আবার চোখ খুলে বলল-'নিজের যত্ন
নিয়ো সুমন। আর লাল
টুকটুকে একটা মেয়েকে বিয়ে করো। তোমাদের খুব
সুন্দর একটা মেয়ে হবে। ওর নাম রেখো অধরা।
ওকে আগলে রেখো সুমন। আর আর আমায়
ভুলে যেয়ো। অনেক অনেক ভালো থেকো সুমন।'

অধরার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল
গড়িয়ে বালিশে পড়ে। কিন্তু যে আমার চোখে
সবসময় চোখে পানি জমে থাকতো, সেই আমার
চোখে কোন পানি জমে না। মেঘের
ঘনঘটা কোথাও পাই না। রুম থেকে বের
হয়ে আসি আমি। খুব নির্লিপ্ত
ভাবে মেসে ফিরি। জামা কাপড় গুছিয়ে নেই।
এই শহুরে যান্ত্রিকতায় আর নয় একটি নিশ্বাসও।
গ্রামের পথে পালিয়ে আসি। চোখ আবার
জ্বালা করে ওঠে। বাষ্প জমা হয়। পকেটে হাত
দিয়ে কিছুটা হোঁচট খাই। পকেটে রুমালটা নেই।
মনে পড়ে সেই ছোট্ট স্মৃতিগুলো। অধরাই রোজ
বাইরে বেরোবার সময় মনে করিয়ে দিত রুমাল
সাথে নিতে। আর কোনদিন ভুল
করে না নিয়ে গেলে নিজের রুমালটাই
দিয়ে দিত। রুমাল দিয়ে দেয়ার পর ওর প্রচন্ড কষ্ট
হত। তারপরও আমাকে কিছু বলত না। উল্টো তখন
ছায়ার মত লেগে থাকত আমার চোখ মুছে দেয়ার
জন্য।
পাখির ডাকে বাস্তবে ফিরে আসি।
বাড়িতে পৌছেই ছুটে যাই আমার বাবার কাছে।
আমার স্বপ্ন দেখানো প্রিয় বাবা। অসুস্থ
হয়ে শয্যাশয়ী ।

*'বাবা, আমি তোমার ঘুড়িতে করে তোমার
রাজকন্যাকে আনতে পারিনি।
-বাজান কি হইছে তোর?
*বাবা, ঘুড়ির সুতো কেটে তোমার
রাজকন্যা অনেক দুরে চলে গেছে বাবা। অনেক
বেশি দুরে
-শক্ত হ বাজান। তোকে আরো শক্ত হতে হবে।

তোর মা দেখ, তোর দেশটাকে দেখ,
কাঁনতেছে। এই দ্যাশটা তো তোর জন্য কত
ঘুড়ি দিল। বাজান, তুই পারবি না এই দেশটার
জন্য তোর একটা ঘুড়ি দিতে? তোর হাতে এখনও
অনেক ঘুড়ি আছে বাজান। এই দেশটার জন্য হলেও
তোর ঘুড়িগুলা কাটতে দিসনা বাপজান।'
বাবার ঘর থেকে বের হয়ে আসি। আমার
পুরোনো রুমটার তালা খোলা। রুমের
মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে অবাক হই আমার
ছোটবেলার ঘুড়িটা দেখে....
আমার প্রিয় ঘুড়িটা নিয়ে সেই প্রিয় খেলার
মাঠটাতে চলে আসি। আস্তে আস্তে বাতাসের
বেগ বাড়তে থাকে। নাটাই-
টা আস্তে আস্তে ছাড়ি। দুর
থেকে আরো দুরে চলে যায় ঘুড়ি। নাটাইয়ের
সূতোও একসময় শেষ হয়ে যায়। তবুও মন্ত্রমুগ্ধের মত
তাকিয়ে থাকি দূর আকাশের দিকে, ঘুড়িটার
দিকে। অনেকগুলো ঘুড়ি অপেক্ষা করছে আমার
জন্যে। কিভাবে, কিভাবে এদের
একা ফেলে চলে যাব
আমি??

বৃষ্টি, ভেজা, মন--, অন্যরকম ভালবাসা

Edit Posted by with No comments
অঝোর ধারায় আকাশটা কেঁদেই যাচ্ছে। চুপচাপ
জানালার পাশে বসে আছে নিশিতা। ডেস্কের
উপর অফিসের ফাইল-পত্রের ছড়াছড়ি। অনেক
কাজ পড়ে আছে। কিন্তু কিছুতেই কাজে মন
বসাতে পারছেনা ও। না চাইতেও বারবার
চোখটা চলে যাচ্ছে মোবাইলের দিকে। কিন্তু
না আসছে কোন কল, না আসছে কোন মেসেজ।

কি করে ভুলে যেতে পারলো ইমন। আজ ওদের
ফার্স্ট ম্যারিজ ডে। কাল রাত থেকে ও ইমনের
একটা কলের জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ ইমন
কিনা ভুলেই গেলো। দুদিন আগে ইমন
জরুরী কাজে ঢাকার বাইরে গেছে। হয়তো প্রচন্ড
কাজের চাপ ওখানে। তাই বলে আজকের দিনটার
কথা ভুলেই যাবে। ও তো খুব বেশি কিছু চায়নি।

শুধু একটা ফোন, সেটা কি খুব বেশি কিছু। প্রচন্ড
কান্না পাচ্ছে নিশিতার। এজন্যই ও ডাক্তার
প্রজাতি একদম সহ্য করতে পারে না। সারাদিন
শুধু কাজ আর কাজ। কাজ আর পড়ালেখার বাইরেও
যে একটা জীবন থাকতে পারে, সেটা তাদের
জ্ঞানের পরিধির বাইরে। কিন্তু ওর কপালে সেই
প্রজাতির-ই একজন জুটলো। সবই কপাল।

ভার্সিটি লাইফে কপোত-কপোতীদের
দেখে নিশিতাও স্বপ্ন দেখেছিল হয়তো ওর
জীবনেও একদিন এমন কেউ আসবে যে ওকে অনেক
ভালোবাসবে। অতঃপর তাদের বিয়ে হবে, ছোট্ট
একটা সংসার হবে...ব্লাহ...ব্লাহ...ব্লাহ।
মোটকথা প্রেমের বিয়ের প্রতি ভীষন রকমের
একটা আকর্ষন ছিল নিশিতার। কিন্তু দূর্ভাগ্য
কিংবা সৌভাগ্যবশত তার আর প্রেম
করা হয়ে উঠলো না।

সেদিনের কথা আজও মন আছে নিশিতার। ক্লাস
শেষে ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে দেখে ইমন
দাঁড়িয়ে আছে। নিশিতা এগিয়ে গেলো। ইমন
নিশিতার মায়ের খালাতো বোনের ছেলে।
সম্পর্কে কাজিন হওয়া সত্ত্বেও ইমনের সাথে ওর
তেমন কথা-বার্তা হয় না, তা অবশ্য ইমনের
লাজুক স্বভাবের কারনেই। একেতো ডাক্তার, তার
উপরে ভ্যান্দা টাইপের এই ছেলেটার
সাথে নিশিতাও তাই যেচে কখনো তেমন
কথা বলেনি। কিন্তু এই ভ্যান্দা তার
ডিপার্টমেন্টের
সামনে দাঁড়িয়ে কি করছে সেটা মিলাতে পারছিল
না ও।
- আররে ইমন ভাইয়া যে...হঠাত এদিকে?
কি মনে করে?

- আসলে একটা কাজে এখানে এসেছিলাম।
তাছাড়া আজকে তোমাদের বাসায় যাওয়ার
কথা। এখান থেকেই যেতাম। কিন্তু আম্মু
ফোনে বললো তুমি নাকি ক্যাম্পাসে। তাই
ভাবলাম গন্তব্য যখন একটাই তাহলে একসাথেই
যাই।

- ও। ঠিক আছে। চলো।
সেদিন বাসায় যাওয়ার পথে এমনকি যাওয়ার
পরেও ওদের মধ্যে তেমন কোন কথা হয়নি কিন্তু
সেই সময়টাতে নিশিতার মনে হাজারো প্রশ্নের
ঝড় উঠেছিল। সেই ঝড় থামলো যখন
রাতে নিশিতা ঘুমুতে যাওয়ার যখন ওর
মা এসে ইমনের সাথে ওর বিয়ের প্রসংগ তুললো।
কথাটা শোনামাত্রই ওর মাথায় যেন আকাশ
ভেঙ্গে পড়লো। নিশিতার মা প্রায়ই
দুষ্টুমি করে ওকে বলতো, “ডাক্তার পছন্দ করিস
না তো। দেখবি শেষ পর্যন্ত তোর
কপালে একটা ডাক্তারই জুটবে।“ নিশিতা তখন
হেসে সে কথা উড়িয়ে দিত। কিন্তু
সে কথাগুলো যে এভাবে সত্যি হয়ে যাবে তা ও
কল্পনায়ও কখনো ভাবেনি।
যেহেতু ওর নিজের তেমন কোন পছন্দ নেই, আর ওর
বাবা-মাও অনেক সাধ করে ইমনকে ওর জন্য পছন্দ
করেছে, তাই অগত্যা ওকে রাজি হতে হলো।
দেখতে দেখতে বিয়ের একটা বছর যে কি করে পার
হয়ে গেল নিশিতা এখনো তো ভেবে পায় না।
হসপিটাল, চেম্বার আর রোগী নিয়ে দিনের
বেশিরভাগ সময়ই ইমন ব্যস্ত থাকে। কিন্তু ওই
ব্যস্ততাটুকু ছাড়া গত এক বছরে ইমনের
বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো আর কিছুই
খুঁজে পায়নি নিশিতা। ভীষন রকম
ভালোবাসতে জানে ভ্যান্দা টাইপের এই
ছেলেটা। তাই কিছুতেই ভেবে পায় না ও,
কি করে ইমন ভুলে গেলো।
হঠাত একটা শব্দে চমকে ওঠে নিশিতা। খেয়াল
হতেই বুঝতে পারে দরজায় কেউ নক করছে।
“ইয়েস, কাম ইন” বলে নিজের
ডেস্কে গিয়ে বসে ও।
- ডিস্টার্ব করলাম?
- তুমি!!!
- হুমম। চলে এলাম।
- কালকেও তো কথা হল। বলোনি তো আসবে!
- বলিনি। ব্যস্ত?
- না। কেন?
- ঘুরতে যাবো।
- এই বৃষ্টির মধ্যে!
- হুমম। কেন? তোমার কি এলার্জি আছে বৃষ্টিতে?
- না, তা হবে কেন? তুমি একটু বসো, আমি হাতের
কাজটা গুছিয়ে নিই।
- ওক্কে। ফাইভ মিনিটস। তুমি কাজ
গুছিয়ে আসো। আমি গাড়িতে আছি।

ইমন বেরিয়ে যেতেই নিজের উপর ভীষন রাগ
উঠে নিশিতার। কি ও! এতোদিনেও
ইমনকে চিনতে পারলো না ও। ছেলেটা শুধুমাত্র
ওর জন্য এতোদূর থেকে ছুটে এসেছে। আর ও কিনা!
আশুলিয়ার রাস্তা ধরে ওদের
গাড়িটা এগিয়ে চলছে। কারো মুখে কোন
কথা নেই। দুজনের মুখেই মিটিমিটি হাসি, যেন
নতুন কোন কপোত-কপোতী একসাথে মেঘের
মাঝে ভাসছে। স্লো ভলিউমে রবীন্দ্র সঙ্গীত
বাজছে। মাঝপথে হঠাত গাড়ি থামায় ইমন।
- কি হলো? এখানে থামালে যে?
- ভীষন ভিজতে মন চাইছে বৃষ্টিতে।
চলো না ভিজি।

বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে ইমন। কিছুই বলার
সুযোগ দেয় না ওকে।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে নিশিতা।
যে ছেলে বৃষ্টিতে একটু ভিজলে ঠান্ডা জ্বর
বাঁধিয়ে বিশ্রী অবস্থা করে ফেলে বলে বৃষ্টি একদম
সহ্য করতে পারে না, সে আজ শখ
করে বৃষ্টিতে ভিজছে।

গাড়ি থেকে নামতেই একটা হিম শীতল শিহরন
বয়ে যায় ওর শরীরে। ইমনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়
নিশিতা। আলতো করে ওর হাতটা ধরে ইমন।
দুজনেই নদীর জলে বৃষ্টির জল
মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার অপরূপ দৃশ্য
দেখতে থাকে অপলক দৃষ্টিতে।

অন্যরকম ভালবাসা

Edit Posted by with No comments
অন্যরকম ভালবাসা--
মিজান দশম শ্রেণীর ছাত্র । শহরের
একটা স্কুলে লেখাপড়া করে সে। শুধুমাত্র ওর
পড়াশুনার জন্যই পুরো পরিবারের, গ্রাম
থেকে এসে এইশহরে থাকা । বাবা চাকরির
জন্য এখানে থাকতে পারেন না,
সপ্তাহে দু'একদিন আসেন । তাই মা'কেই
সামলাতে হয় সংসারের
পুরো দায়িত্ব।

মধ্যবিত্ত পরিবার, তাই সারা বছর টানা পোড়েন
লেগেই থাকে । লেখাপড়া,বাড়ীভাড়া,বাজার-
খরচ চালাতে মুটামুটি হিমসিম থেতে হয় তাকে,
তার উপর আবার চিরসঙ্গী কোমরের ব্যাথা! শত
কষ্টের মাঝেও তিনি নিজের কথা ভুলে ছেলের
সকল চাহিদা পূরন করেন।
~ ~ ~ ~ ~ ~ ~ ~ ~ ~
কিছুদিন পর ১৪ই ফেব্রুয়ারী।
বন্ধুমহলে আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে,"কে কার
প্রিয়জনকে কি gift দেবে?"এই নিয়ে । মিজানের
অবশ্য তেমন বিশেষ কেউ নেই। কিন্তু সেও gift
কেনার জন্য টাকা জমাতে থাকে। সে ঠিক করে,
এবার 'ভালবাসা দিবসে' মাকে একটা কিছু
দিবে ।
মার্কেটে অনেক ঘুরাঘুরির পর খুবসুন্দর
একটা শাড়ী পছন্দ করে মায়ের জন্য । কিন্তু
বিপত্তিটা হল দাম নিয়ে! শাড়ীটার দাম
লেখা ৭০০/- টাকা.!(একদর)। কিন্তু ওতো এই
ক'দিনে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মাত্র ৩৫০
টাকা জমাতে পেরেছে.! তাই হতাশ
মনে বাড়ী ফেরে সে । ভেবে পায়না,
কি দেবে মাকে । এদিকে ১৪ই
ফেব্রুয়ারী আসতে আর মাত্র একদিন বাঁকি!
অবশেষে সারারাত অনেক
ভেবেচিন্তে একটা আইডিয়া মাথায় আসে!
পরদিন সকালে পা টিপে টিপে মা'র ঘরে যায়,
দেখে মা নামাজ পরছে । চুপিচুপি মায়ের ড্রয়ার
থেকে কি যেন একটা নেয়! তারপর ভাঁজ
করে পকেটে রেখে দ্রুত কেঁটে পরে । এরপর
সোজা চলে যায় দোকানে ।
এদিকে, রাত থেকেই মায়ের কোমরের
ব্যাথাটা বেড়েছে । তাই তিনি ভাবলেন, আজ
অন্তত দুটো ট্যাবলেট কিনে খাবেন ।
অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তিনি ঔষধের
প্রেসকিপ্শনটা খুঁজে পাচ্ছেন না । কিন্তু
ড্রয়ারের মধ্যেই তো ছিল ওটা! গেল কোথায়?
এমন সময় মিজান, সুন্দর একটা গিফ্ট পেপার
দিয়ে মোড়া একটা প্যাকেট নিয়ে মায়ের
কাছে হাজির । মুখে এক চিলতে হাসি, আজ
সে মহাখুশী!
মাঃ এটা কি?
মিজানঃ আজ 'বিশ্ব ভালবাসা দিবস'
তাই তোমার জন্য gift..!
মাঃ এর মধ্যে কি?
মিজানঃ আঃহা খুলেই দেখনা.!
মা অত্যন্ত যত্নের সাথে প্যাকেটটি খোলেন ।
এবং খুলে যা দেখেন, তাতে তো তিনি হতবাক!
প্যাকেটের মধ্যে রয়েছে তার কোমরের
ব্যাথা আর প্রেসারের অনেকগুলো ট্যাবলেট!
প্রায় ১মাসের ওষুধ,সাথে প্রেসকিপ্শনটাও!
মাঃ বোকা ছেলে, এসব তুই কেন কিনতে গেলি...
মিজানঃ আমি জানি মা, ঔষধগুলো তোমার জন্য
অনেক দরকারী । কিন্তু
প্রতিমাসে বাড়িভাড়া,বাজার-খরচ আরআমার
টিউশন ফি দিতে গিয়ে তোমার ওষুধ কেনার
টাকা থাকেনা ।
মাঃ কিন্তু ....এতোগুলো টাকা তুই কোথায়
পেলি..?
মিজানঃ টিফিনের
টাকা থেকে বাঁচিয়েছি মা ।
আবেগাপ্লুত মা মিজানকে বুকের
মাঝে জড়িয়ে ধরেন... আর বলেন,"তুই অনেক অনেক
বড় হ বাবা..!"
বলতে গিয়ে মায়ের চোখে পানি চলে আসে ।
মিজান আলতো করে তা মুছে দেয় ।